মোহনবাগান ক্লাবের উজ্জ্বল ইতিহাস

 মোহনবাগান ক্লাবের উজ্জ্বল ইতিহাস

-        রাহুল মাইতি
-        Rahulmaitycr7@gmail.com

-         

মোহনবাগানের ইতিহাসকে যদি সময়ের নিরিখে চারটি  ভাগে ভাগ করা যায় তাহলে তার ইতিহাসটা কিছুটা এরকম আকারে দাঁড়াবে।

১. প্রথম পর্যায় : ক্লাবের জন্মলগ্ন (১৯১১ - ১৯৩০)

আর পাঁচটা বছরের মতো ১৯১১ কোনও সাধারণবর্ষ ছিলনা বাঙালিদের জন্যবাঙালির ইতিহাসে গৌরবোজ্বল অধ্যয়ের ১৯১১ খ্রীস্টাব্দটা যেন বড়ই বিস্তারিতইংরেজশাসিত ভারতবর্ষের বুকে ইংরেজদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার স্পর্ধা তখন কেবল গুপ্ত সমিতির অধীনেইগুপ্ত সমিতির কার্যকলাপ গুপ্তভাবে ইংরেজদের উপর ক্রমশ আঘাত হানছিল ক্রমশই, সেমত পরিস্থিতিতে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে বেরিয়ে সম্মুখ সমরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা ভাবাটাই দুঃসাধ্যএরকমই দুঃসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছিল বাঙলা মায়ের দামাল সন্তানরা।  তাই তো আজও ১১০ বছর পরেও তাদের স্মরণ করা হয় অতি সম্মানের সাথেঠিক কি ঘটনা ঘটেছিল জানার জন্যা আমাদের একটু সিংহাবলোকন করতে হয়

তারপর দেখতে দেখতে একদিন ফুটবল খেলা ঢুকে পড়লো বাঙালী সমাজের অন্দরমহলে। গজিয়ে উঠতে থাকলো একের পর এক ফুটবল ক্লাব।  কলকাতা তখন নিয়তই নিজের রূপ পরিবর্তন করে চলেছে। শ্যামবাজার অঞ্চল তখন বেশ ফাঁকা ফাঁকা, বেশি জনবসতি তখনও গড়ে ওঠেনি। শ্যামবাজারের মোড়ের কাছাকাছি সার্কুলার রোডের সঙ্গে এসে মিশেছে মোহনবাগান লেন আর ফড়িয়াপুকুর স্ট্রীট। একপাশে ফড়িয়াপুকুর, অন্যদিকে মোহনবাগান লেন আর ফড়িয়াপুকুর স্ট্রীট। ফড়িয়াপুকুরের নাম বর্তমানে বদলে শিবদাস ভাদুড়ি স্ট্রীট।  এই দুই স্ট্রীটের মাঝেই মস্ত এক ইমারত, নাম মোহনবাগান ভিলা। ১৮৮৯ সালের আগস্ট মাসের একটি দিন। ১৪ নং বলরাম ঘোষ স্ট্রীটে ভূপেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে সভা বসলো। সেই সভায় ঠিক হলো, মোহনবাগান ভিলায় যারা খেলছে তাদের নিয়ে গড়া হবে একটি নতুন ক্রীড়া সংগঠন – মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব।

ভূপেন্দ্রনাথ বসু হলেন নতুন ক্লাবের প্রথম সভাপতি।  প্রথম সম্পাদক যতীন্দ্রনাথ বসু। ক্লাবের প্রথম অধিনায়ক হলেন মণিলাল সেন। ক্লাবপ্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই চরম অনুশাসনের পরিখায় বেষ্টিত করা হলো সদস্যদের।  মহৎ আদর্শকে সামনে রেখে কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগলো। মোহনবাগান ক্লাবের আদর্শ ও ইষ্টমন্ত্র ছিলো – Play the game in the spirit of the game.

প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকিতেই সভাপতি হয়ে এলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক রো সাহেব। তার মতামত গ্রহণ করে ক্লাবের নামে এলো পরিবর্তন, স্পোর্টিং ক্লাব থেকে মোহনবাগান হলো – মোহনবাগান আ্যথালেটিক ক্লাব।  সে যুগের নামকরা ভারতীয় বা বাঙালিদের দলগুলো মোহনবাগানকে নূন্যতম সম্মানও দেয়নি, বরং সুযোগ পেলেই অপমান করেছে, বিদ্রুপ করেছে, অবহেলা করেছে।  ক্রিকেট খেলার সাথে সাথে মোহনবাগানের ক্লাবে ক্রিকেট খেলাও হতো, কিন্তু কখনোই তা ফুটবলের জনপ্রিয়তা স্পর্শ করতে পারেনি।  আকারে বর্ধিত হতে হতে মোহনবাগানের ক্লাবের সদস্য সংখ্যা যখন আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন তারা চলে এলেন শ্যামপুকুরে লাহাদের মাঠে।  এভাবেই জন্ম নিলো মোহনবাগান আ্যথলেটিক ক্লাব।

১৯০৪ সালে কোচবিহার কাপে জয় দিয়ে শুরু হয় মোহনবাগান ক্লাবের জয়যাত্রা।  পরের বছরও কোচবিহার কাপ জয় করে মোহনবাগান।  সেবারের গ্লাডস্টোন খেলার ফাইনালে মোহনবাগান মুখোমুখি হয় ডালহৌসী ক্লাবের সাথে।  গোরা সাহেবদের সাথে প্রতিযোগিতা মূলক খেলায় ফাইনালে বোধহয় সেই প্রথম বার। সাহবদের বুট্ পরা পায়ের সাথে মোহনবাগানের খলি পায়ের লড়াই। সেবার ডালহৌসীর মতো ক্লাবকে ৬-১ গোলে হারায় মোহনবাগান। মোহনবাগানের মাথায় তখন নতুন পালক। পরের বছর আরও সাফল্য পেলো মোহনবাগান । কোচবিহার, গ্লাডস্টোন আর ট্রেডস কাপের সাফল্য রাতারাতি মোহনবাগানকে দেশীয় দলগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা এনে দিলো।  ১৯০৭ এর পর থেকে তিনবার মোহনবাগানের ঘরে ওঠে ট্রেডস কাপ, এবং তারপরই তারা স্বপ্ন দেখতে থাকে আই.এফ.এ শিল্ড খেলার।

১৯১১ সালের ঐতিহাসিক জয়

তরপরই এলো ১৯১১ শিল্ড প্রতিযোগিতা।  মোহনবাগান দলটিকে ঢেলে সাজালেন শিবদাস ভাদুড়ি। দলনির্বাচন নিয়ে তখন যথেষ্ট সমালোচিতও হতে হয়েছিল শিবদাসকে। এবং দলের অধিনায়ক শিবদাস ভাদূড়ি নিজের পছন্দমতো দল নিয়েই শিল্ডে নামলেন।  প্রথম রাউণ্ডেই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের বিরুদ্ধে মোনহবাগানের খেলা। সেন্ট জেভিয়ার্সে তখন কেবল শ্বেতকায় ছেলেরাই খেলতেন।  দলটা তখনকার দিনে বেশ শক্তিশালী হলেও মোহনবাগানের সামনে দাঁড়াতে পারলো না। তিন গোলে হারলো তারা। এরপর দ্বিতীয় রাউণ্ডে মোহনবাগানের মুখোমুখো হলো রেঞ্জার্স। মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের কাছে একটা সমস্যা ছিলো গুরতর, তা হলো বৃষ্টি, কারণ তখনও তারা খালি পায়ে খেলে, আর সাহেবরা খেলে বুট পরে, তাই বৃষ্টি হলে খালি পায়ে মাঠে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টের, সে তুলনায় বুটে অনেক সুবিধা।  রেঞ্চার্সের সাথে খেলার দিনে বৃষ্টির সম্মুখীন হতে হলো তাদের কিন্তু কপাল ভালো থাকায় বৃষ্টির আগেই দুই গোলে এগিয়ে থাকার সুবাদে জয়ী হয় মোহনবাগান। এই ম্যাচে অবিশ্বাস্য খেলেছিলেন গোলকিপার হীরালাল মুখার্জী।  এভাবেই মোহনবাগানের জয়রথ এসে দাঁড়ালো কোয়ার্টার ফাইনালে রাইফেল বিগ্রেডের বিরুদ্ধে। যদিও সেদিন মোহনবাগান খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি, কিন্তু গোলকিপার হীরালালের হাতের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করতে পারেন গোরা সৈনরা। প্রায় একাই একপ্রকার জয় নিশ্চিত করেন হীরালাল মুখার্জী। শেষমেশ শিবদাসের গোলে ১-০ শুন্য ব্যাবধানে জয়ী হয় মোহনবাগান।

মোহনবাগান এখন সেমির দোড়গড়ায়। এ যেন এক নবজাগরণ। এক সুতোয় বেঁধে গেলো হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী। স্থাল কাল পাত্র ভুলে সকলে মেতে উঠলেন এক অদ্ভুত নেশায়। সে নেশা জাতীয়তাবোধের। খেলার গণ্ডি টপকে কখন যে জাতীয়বাদের লড়াইয়ে পরিনত হয়েছে তা বোঝা দুষ্কর। রাজার প্রজায় লড়াই হলে রাজার পরাজয় দেখার স্বপ্ন সকলেরই থাকে। দেশবাসী সেই স্বপ্নেই বিভোর হয়ে আছে। সমরে না হোক খেলার মাঠেই যদি সাহবদের হারানো যায় সেই আনন্দই বা কম কীসের।  পরাধীন ভারতবর্ষ যেখানে প্রতিমুহূর্তে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে আপামার ভারতবাসীকে, সেখানে তথাকথিত নেটিভদের হাতে হেরে ভূত হয়ে যাবে সাদা চামড়ার প্রভুর দল, এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে। তাই লক্ষ লক্ষ লোকের মনে প্রার্থনা – হে ভগবান হারিয়ে দাও সাহবদের। জিতিয়ে দাও মোহনবাগানকে।

            অন্যদিক থেকে ফাইনালে উঠেছে , তখনকার দিনের সেরা দল ইস্ট ইয়র্ক। শেষ পর্যন্ত এসে গেলো ফাইনালের দিন। সেদিন সকাল থেকেই অত্যুত্সাহী জনতার একটাই গন্তব্য কলকাতা ময়দান, সকলের পায়ে যেন একটা নির্দিষ্টি ঠিকানা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, স্টিমার নৌকা ঘোড়ার গাড়ি গোরুর গাড়ি পাল্কী সকলই চলেছে ময়দানের অভিমুখে। মাঠ যেন জনারন্য, তিল ধারণের স্থান নেই। মাঠের একদিকে ক্যালকাটা ক্লাবের সদস্যদের জন্য আসন, ওপর দিকে বি এইচ স্মিথ কোম্পানীর সাময়িক আসন – অপর দুই দিক খোলা, সেদিকেই সাধারণ মানুষের জোয়ার নেমেছে। খেলা দেখতে পাবেন হয়তো কয়েক হাজার মানুষ, কিন্তু মাঠে উপস্থিত ছিলেন লক্ষাধিক মানুষ। সকলেরই একটা কামনা মোহনবাগান জিতুক, সাহবদের গর্ব খর্ব হোক।

            শুকনো খটখটে মাঠ। খেলা চলছে প্রচন্ড গতিতে। বুট পরা সাহবদের সঙ্গে খেলছে নাঙ্গা-পা ভেতো বাঙালি ছেলেরা। সমান ভাবে প্রতিদ্বন্দিতা করছে দুই দলই।  কিন্তু প্রথমার্ধেই এক গোল হজম করতে হলো মোহনবাগানকে। খেলা শেষ হতে তখন ১০ মিনিট বাকি হঠাৎই ব্যাক থেকে একটা বল পেয়ে শিবদাস তরতর করে এগিয়ে গেলো ইস্ট ইয়র্কের গোলের দিকে, এবং এপা-ওপা করতে করতে বলটা প্রচণ্ড গতিতে মারলেন ত্রেকাঠির মধ্যে,গোরা গোলকিপার কিছু বুঝে ওঠার আগেই বল গিয়ে জড়িয়েছে জালে, বাঙালি দর্শকদের চিত্কারে মাঠ ভরে গেলো সাথে সাথেই। গোল শোধ দিয়ে মনোবল ফিরে পেয়েছে মোহনবাগান শিবির। বাড়তি উত্সাহে জেতার আশায় বুক বাঁধছে তারা। খেলা শেষ হতে তখন আর দুই মিনিট বাকি, হঠাৎই শিবদাসের থেকে বল পেয়ে অভিলাষ বলসুদ্ধু ঢুকিয়ে দিলো গোলে।  সঙ্গ সঙ্গে যেন কেঁপে উঠলো কলকাতা শহর জনতার উচ্ছ্বাসে। শুরু হলো এক অবর্ণনীয় উত্সব। অকাল উত্সবের আঁচে গনগন করতে লাগলো সমগ্র কোলকাতা। অসম্ভব সম্ভব করারা আনন্দ বোধহয় অবর্ণনীয়ই হয়। উচ্ছ্বসিত জনতার মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে সরে পড়লেন গোরা সাহেবরা। আকাশে মোহনবাগানের বিজয়বার্তা বয়ে ঘুড়ির ঢল নামলো। মোহনবাগানের বিজয় উৎসবে মেতে উঠলো সমস্ত দেশ। সমস্ত দেশ জুড়ে পালিত হলো বিজয় উৎসব। মোহনবাগানের সাফ্যলের বন্যায় ভেসে গলো সমস্ত  কলকতা। খেলার মাঠে সাহেবদের পরাজিত করার আনন্দে মশগুল জনতা। রাজায় প্রজায় লড়াই হলে প্রজার জয় কম ব্যাপার না।   

            এই জয় উৎসর্গিত হয়ে ছিলো সমগ্র ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে। যার মোহনবাগানের স্বপ্নকে নিজেদের করে নিতে পেরেছিলো। এই জয় ছিলো অনেকটা মৃত সঞ্জীবনীর ন্যায়। যা মৃতপ্রায় এক জনজাতিকে আবার জাগিয়ে তুলতে পেরিছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। ধিক্-ধিক্ করে জ্বলতে থাকা আগুনে কেও যেন ঘৃতাহুতি দিয়ে গেলো। ভারতবাসী অন্তত মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে পেরেছিলো ব্রিটিশ রাজ অপরাজেয় নয়। তাদেরও হারানো যায়।

            এই জয়ের তাৎক্ষণিক গুরুত্ব তো আছেই সাথে আছে অপরিসীম ঐতিহাসিক গুরুত্বও।  এই জয় এমন একটা সময়ে এসেছিলো যখন ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষ ব্রটিশ রাজের কাছে আত্মসমর্পন করেই দিয়েছে। তাই আজও একশো বছর পরেও এই জয়ের কাণ্ডারীদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

            বিট্রিশদের বিরুদ্ধে খালি পায়ে খেলা একটা দলের সংগ্রাম কীভাব সমগ্র জাতির মর্যাদা কুঁড়িয়ে নিয়েছিলো তা আমরা দেখিয়িছি। এই পর্বের ইতিহাসের শুরুটা তাই অত্যুজ্বল কালিতে লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত মোহনবাগান আর কোনও মেজর টুর্নামেন্টে সেভাবে দাগ কাটতে পারেনি। অনেক বড়ো বড়ো বাঙালি খেলোয়াড় এসেছেন ক্লাবের পদতলে কিন্তু কখনই সাফ্যলের আস্বাদ পাওয়া হয়নি মোহনবাগানের। গোষ্ঠপালের মতো সুদক্ষ খেলোয়াড়ের জন্ম  দিয়েছে এই ক্লাব। এবং তখন থেকেই বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দল প্রতিযোগিতা মূলক খেলায় অংশ নিতে শুরু করে, এবং সেই সময়ের ভারতীয় দলেও নিয়মিত খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেকেই ছিলেন মোহনবাগানের সদস্য। এই সাফল্যও কম নয়। কলকাতার ক্লাবগুলিকে নিয়ে যে আন্তঃকলিকাতা লিগ শুরু হয় সেখানেও ভালো ফল করে মোহনবাগান। প্রথম বছরেই কুমোরটুলির কাছে পরাজিত হয়ে রানার্সের মর্যাদা পায় তারা। ১৯৩০ সালে তারা কোচবিহার কাপ জয় করে। সেবছরই রোভার্স কাপে খেলার ডাক পায় মোহনবাগান এবং রানার্স হয়। ১৯২৪ তারা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ভূপেন্দ্রনাথ বোস কে হারায়। ১৯২৫ সালে প্রথম দেশীয় দল হিসাবে তারা ডুরান্ড কাপ খেলার জন্য ডাক পায়। এবং সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়। ১৯২৬ এর আই.এফ.এ শিল্ডে থার্ড রাউন্ড থেকেই ফিরে আসতে হয়। মোহনবাগান ততদিনে ক্লাবের থেকেও বড় কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছ, ১৯২৭ এ গুজরাটে প্রবল বন্যা হয়, তাদের সাহায্যের জন্য মোহনবাগান ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলে অর্থ সংগ্রহ করে। ১৯২৮ এ তার পাওয়ার লীগ জয় করে। কোচবিহার কাপ কজয় করে চতুর্থ বারের জন্য।

২. দ্বিতীয় পর্যায় : ক্লাবের স্বর্ণযুগ (১৯৩০-১৯৫০)

            ১৯৩০ সালে সারা ভারত দাঙ্গার আগুনে জ্বলছে, রাজনৈতিক ডামাডোল অব্যাহত,  এমত অবস্থায় মোহনবাগান কোনও লীগ খেলতে অস্বীকার করে। ১৯৩১সালে ক্লাব প্রেসিডেন্ট শৈলেন্দ্রনাথ বোস দেহত্যাগকরলে মোহনবাগান ক্লাবে শোকের ছায়া নেমে আসে। ১৯৩৩ সালে মোহনবাগান দ্বারভাঙ্গা শিল্ডে জয় লাভ করে। এছাড়াও অনেকগুলি ছোটো শিল্ড জয় করে তারা। ১৯৩৪ তারা কলকাতা লীগে মাত্র তিন পয়েন্টের ব্যাবধানে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। ১৯৩৫ এ কোচবিহার কাপে পুনরায় জয় লাভ করে মোহনবাগান। এবছর দলে এক আমূল পরিবর্তন ঘটে, প্রথমবারের জন্য মোহনবাগান দলের জন্য বুট আনা হয়। তারা প্রথমবারের জন্য বুট পরে খেলতে শুরু করে। এর জন্য আব্দুল হামিদের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৩৭ সালে প্রথমবার তারা বিদেশী ক্লাবের বিরুদ্ধে বিদেশের মাটিতে খেলা শুরু করে। ১৯৩৮ এ তারা ট্রেডার্স কাপে জয়লাভ করে। ১৯৩৯ সালে প্রথমবারের জন্য কলকাতা লীগ জয় করে। সেই সময়ের অধিনায়ক ছিলেন বিমল মুখার্জী। এছাড়াও বেশ কয়েকটি ছোটো খাটো শিল্ড জয় করে মোহনবাগান।

            ১৯৪০ সাল ক্লাবের গোল্ডেন জুবলি বর্ষ ছিলো।  এবছরেই আই.এফ.এ শিল্ডের ফাইনালে পৌঁছায় মোহনবাগান। ১৯৪১ সালে মোহনবাগান লেডি হার্ডিং শিল্ড, চণ্ডিচরণ মেমোরিয়াল শিল্ড, কোচবিহার কাপ, লক্ষীবিলাস কাপ, কোহিনূর কাপ, হাজারিবাগ কাপ,রাজা শিল্ড জয় করে। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য কলকাতা লীগের খেতাব অর্জন করতে সফল হয় মোহনবাগান। ১৯৪৪ ট্রেডার্স কাপে জয় লাভ করে মোহনবাগান। ১৯৪৫ সালে মেদনীপুরে ভয়াবহ বন্যা হলে বন্যার জন্য তহবিল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কয়েকটি চ্যারিটি ম্যাচ খেলে তারা। সেবছরই মণিলাল সেন ক্লাবের প্রথম অধিনায়ক দেহত্যাগ করেন।  এবং এবছরই আই.এফ.এ শিল্ডের ফাইনালে পরাজিত হয় ইস্টবেঙ্গলের কাছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে এই ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়েই আই.এফ.এ শিল্ড জয় করে তারা।  এবং আজকের দিনে ইস্টবেঙ্গলের সাথে মোহনবাগানের খেলার উত্তেজনা লক্ষ করা যায় তা কিন্তু চল্লিশের দশক থেকেই চলে আসছে। ১৯৪৮ সালে আবার আই.এফ.এ শিল্ড জয় করে পরপর দুাবার এই খেতাব জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে তারা। সেবার প্রথম বারের জন্য ভারতীয় দল অলিম্পিক্স ফুটবলে খেলার সুযোগ পায় এবং ভারতীয় ফুটবল দলে ক্যাপ্টেন হিসাবে নির্বাচিত হয় মোহনবাগানের টি.আও।   

৩. তৃতীয় পর্যায় : ক্লাবের উত্থানপর্ব ( ১৯৫০ -১৯৭০)

            ১৯৫০ সালে মোহনবাগানের ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয় শৈলেন মান্না। এবং তার অধিনায়কত্বে দল ডুরান্ড কাপের ফাইনালে স্থান করে নেয়।  ১৯৫২ সালে আবারও আই.এফ.এ শিল্ড জয় করে মোহনবাগান। এবছরই হেলসেঙ্কি শহরে অনুষ্ঠিত অলম্পিক্সে ভারতের হয়ে খেলার জন্য মোহনবাগান ক্লাব থেকে শৈলেন মান্না সহ তিন জন ডাক পায়।  ১৯৫৩ সালে প্রথম বারের জন্য তারা ডুরান্ড কাপ জয় লাভ করে। ১৯৫৪ সালে ক্লাবের মুকুটে আরও একটি পালক জুড়ে যায়। এবছরই ক্লাব আই.এফ.এ শিল্ড জয়ের সাথে সাথে কলকাতা লীগ জেতে। ১৯৫৬ সালে পুনরায় আই.এফ.এ শিল্ড নিজেদের তাবুতে ফেরাতে সফল হয় ক্লাব। ১৯৫৭ সাল কিন্তু ক্লাবের পক্ষে মোটেও সুখকর ছিলো না। কিন্তি পরের বছরই আই.এফ.এ শিল্ডের ফাইনালে রানার্স হয় তারা।  ১৯৬০ সালে অনেকখানি সফল হয় ক্লাব, একই বছরে ডুরান্ড কাপ ও আই.এফ.এ শিল্ড উভয়ের অধিকারী হয় তারা। ক্লাবের অধিনায়ক চুনী গোস্বামি ১৯৬৩ সালে অর্জুন পুরস্কার লাভ করেন।  ১৯৬৬ সালে রোভার্স কাপে জয় পায় ক্লাব। ১৯৬৭ সাল ক্লাবের পক্ষে খুব একটা সুখকর ছিলো না।  ১৯৬৮ সালে পুনরায় রোভার্স কাপে জয় পায় তারা।  পরের বছর তারা আই.এফ.এ শিল্ডে ফাইনালে পরাজতি হয় তারা।

৪. চতুর্থ পর্যায় : (১৯৭০ – অদ্যাবধি)

            ১৯৭০ থেকে আরম্ভ করে ২০২২  পর্যন্ত অনেক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে মোহনবাগান দল। সমস্ত কিছু আর উল্লেখ করছি না, কেবলমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথাই বলব।  

            ১৯৭০ সালে রোভার্স কাপে জয় লাভ করে ক্লাব। শৈলেন মান্না ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার লাব করে। ১৯৭৩ সাল ছিলো সবথেকে দুর্ভাগ্য জনক বছর, এবছর একটিও কাপ পায়নি তারা। ১৯৭৬ সালে তারা বেশ কয়েকটি কাপ পায়। ক্লাব রিফর্ম হয় এবছর। ১৯৭৭ সালে তারা ডুরান্ড কাপ, রোভার্স কাপ, আই.এফ.এ শিল্ড তিনটি মেজর টুর্নামেন্টে জয় পায়। তবে এবছরের সেরা পাওনা ছিলো – ফুটবল সম্রাট পেলের ক্লাবে আগমন। মোহনবাগানের ক্লাবের সদস্যরা সুযোগ পায় পেলের সাথে পা মেলানোর। ১৯৮৪ সালে তারা ডুরান্ড কাপ জয় করে। ১৯৮৭ সালেও পাঞ্জাব পুলিশকে হারিয়ে আই.এফ.এ শিল্ড পায় তারা। ১৯৮৯ সালেও আই.এফ.এ শিল্ড পায়। ১৯৯৩ সালে ফেডারেশন কাপ জয় করে ক্লাব। ১৯৯৯ সালে আই.এফ.এ শিল্ড জয় করে। ২০০৮ সালে ,  ২০০২ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ী দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পায় মোহনবাগান ক্লাব।  ২০১৪ সালে সমস্ত দেশীয় দল গুলিক সাথে নিয়ে শুরু হয় হিরো আই.এস. এল এবং প্রথমবারেই লীগ জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে মোহনবাগান ক্লাব। এবং ২০১৬ সালে পুনরায় আই.এস.এল লীগ জয় করে মোহনবাগান। ১৯-২০ বর্ষেও পুনরায় গোয়াকে হারিয়ে লীগ জিতে নেয় ক্লাব। বর্তমানে সমগ্র ভারতবর্ষের ফুটবলের সর্বোচ্চ লীগ এটিই। এই লিগে তিনবার জয় লাভ করে ইতিমধ্যই নিজেদের জাত চিনিয়েছে মোহনবাগান।  

 

Comments

Popular posts from this blog

স্বভাব

ভয়