ভয়

ভয়

- রাহুল মাইতি 

         হঠাঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় যখন নিজেকে বাড়ির বিছানায় আবিষ্কার করলাম তখন যেন আর আনন্দের সীমা নেই আমার। এমনিতে মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর পাঁচজনের মতো আমিও বিরক্তই হই, কিন্তু পরীক্ষার দিনে পরীক্ষার শ্রেণী কক্ষে পৌঁছাতে দেরী হওয়ার মতো বিশ্রী স্বপ্ন দেখার পর যখন মনে হলো, ওহ, এটা তো একটা স্বপ্ন ছিল মাত্র, পরীক্ষা কাল সকালে তখন বুঝি দেহে প্রাণ এলো। আসলে আমি পরীক্ষার হলে দেরী হবার ভয় পাই। পরীক্ষা নিয়ে অল্প বিস্তর ভয় তো আছেই কিন্তু পরীক্ষার হলে দেরী হয়ে যাওয়ার ভয়টা যেন আরও বেশী। এই ভয়কে সঙ্গী করেই আসলে ঘুমাতে গিয়েছিলাম, তাই মধ্যরাতে এখন অনিদ্রয় কাটাচ্ছি।  এটা এক সমুদ্র ঘটনা থেকে এক পেয়ালা বলা হলো মাত্র, কারণ এরকম শত শত ভয়ের বিষয় আমাদের জীবনে আষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে আছে। প্রত্যকটি মানুষই পৃথক পৃথক বিষয়ে ভয় পায়। আজকের এই প্রবন্ধে ভয় নিয়েই সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করছি।

            মাত্র দুটি অক্ষরবিশিষ্ট শব্দ হলেও ভয়ের সংজ্ঞা বেশ বিস্তারিত। কি এই ভয় যাকে কয়েকটা শব্দদিয়ে কখনোই সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। শাস্ত্রে বা তথাকথিত বইয়ে কোথাও ভয়ের কোনও সংজ্ঞা সেভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না ঠিকই কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে ভয় হলো একটি মানসিক অবস্থা বা মানসিক স্থিতি। এবং এই কারণেই প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে ভয়ের কারণ সর্বদাই পৃথক পৃথক হয়ে থাকে। ভয় মনুষ্যকূলের কোনোও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, ভয় সকল প্রাণীরই অনুভব গোচর বিষয়। বিষয়ের বিস্তার থেকে নিস্তারের জন্য আমার এই প্রবন্ধে কেবলমাত্র মানুষের ভয় নিয়েই আলোচনা করব।

            ভয় কি এই প্রশ্নের সরল উত্তর হিসাবে যদিও পূর্বেই বলা হয়েছে ভয় হলো মানসিক

স্থিতি, তাও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বলা হয়ে থাকে – ভয় হলো মনের অবচেতন স্তরের একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা, যার নির্দিষ্ট কারণ আছে, নির্দিষ্ট সীমা আছে, এবং যখনই এই সীমা অতিক্রম করে তখনই একে ভীতিরোগ বা ফোবিয়া বলা হয়ে থাকে। এই সংজ্ঞাতেও নানান ফাঁক-ফোকর থেকে যায়। আমরা শুধু অবচেতন অবস্থাতেই যে ভয় পাই তা নয়, সচেতন অবস্থাতেও আমাদের নানান বিষয়ে থেকে ভয় জন্মাতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো অশুভ বা বিপদের আশঙ্কা অথবা বেদনার অনুভূতিরি আগাম চিন্তা করে যে মানসিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয় তা হলো ভয় বা ভীতি।

            ভয়ের নির্দিষ্ট একটি কারণ থাকে, এবং ভয়ের একটি ফলও থাকে, ভয়ের জন্ম হয় মূলত মস্তিষ্কে এবং তা ক্রমশ আমাদের মনের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। রবার্ট কখ ইন্সটিটিউটের এক সমীক্ষায়া জানা গেছে শতকরা 3.9 ভাগ জার্মান ব্যাক্তি জীবনের কোনোও না কোনও সময় আতঙ্ক বা ভয়ের সম্মুখন হয়েছেন। শতকরা 20 শতাংশ মানুষের জীবনে কোনও না কোনও সময়ে প্যানিক আ্যটাক হয়।

 চিকিত্সাবিজ্ঞানে ভয়কে ফোবিয়া বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন অদ্ভূত অদ্ভূত বিষয়ে মানুষের ফোবিয়া থাকতে পারে, এবং তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সংজ্ঞাও আছে। যেমন আমাদের অনেকেই আছে যারা উচ্চতা থেকে ভয় পায়, উচ্চতা জনিত ভয়কে চিকিৎবিজ্ঞানে বলা হয় আ্যক্রোফোবিয়া। মানুষ সংঘবদ্ধপ্রাণী, আমাদের অনেকেই আছি যারা একা থাকতে ভীষণ ভয় পাই, একাকীত্ব জনিত ভয়কে বলা হয়ে থাকে -মেনোফোবিয়া। এছাড়াও মৃত্যু জনিত ভয়কে থ্যানাটোফোবিয়া নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই তো কমবেশী নিক্টোফিোবিয়ার শিকার, কি এই নিক্টোফোবিয়া তাহলে শুনুন অন্ধকার জনিত ভয়কে বলা হয় নিক্টোফোবিয়া। এবার আপনি বলুন আপনার নিক্টোফোবিয়া আছে কিনা। এরকমই অনেকের মধ্যে পোকামাকড় জনিত ভয় কাজ করে, তাকে বলা হয় স্কলেসিফোবিয়া।  মহিলাদের মধ্যেই অনেকই আছেন যারা সহজে বাসে ট্রামে ট্রেনে জনসমূহে আসতে চান না, যৌন হেনস্থার শিকার হবার ভয়ে, তাদের এই ভয়কে বলা হয় ইরোটোফোবিয়া।  যে উদাহরণগুলোর উল্লেখ করলাম তার বাইরেও বহু ফোবিয়ার কথা চিকিৎসাশাস্ত্রে বলা হয়েছে। এবারে আসি আমার স্বপ্ন ভীতি নিয়ে, যা নিয়ে আমি লেখা শুরু করেছিলাম, দুঃস্বপ্ন জনিত ভয়কে বলা হয়ে থাকে ওনেইরোফোবিয়া। অর্থাৎ বলা চলে যে আমি পরীক্ষার পূর্ব রাত্রিতে ওনেইরোফোবিয়ার স্বীকার হয়েই থাকি।

ভয় পেলে কী হয়, অর্থাৎ ভয়ের ফলাফল কি এই বিষয়ে আমরা সকলেই অল্পবিস্তর জানি। ভয় পেলে আমাদের রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয়ে যায়, নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যায়, অনেক সময় হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, অনেকের মাথা ঘুরতে থাকে, প্যানিক আ্যাটাক পর্যন্ত বিষয়টা গড়াতে পারে, এবং তা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সম্ভব। এরকম উদাহরণ কম নেই যেখানে ভয় পেয়ে হঠাৎ হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে মানুষের। এছাড়াও ছোটো ছোটো ভয় থেকে মানসিক শান্তিও বিঘ্নিত হতে থাকে। 

            এতাবৎ কাল যাবৎ শুধু নানান ফোবিয়ার কথা শুনে এলাম, একটা প্রশ্ন নিশ্চই সকলের মনে উঁকি দিচ্ছে, তা হলো ফোবিয়ার কি শুধু জন্মই আছে নাকি এর সমাধানাও সম্ভব। এর উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ। প্রত্যেকটি ফোবিয়া থেকেই মুক্ত হওয়া সম্ভব। তবে তার জন্য দরকার প্রচণ্ড মানসিক শক্তি। মনের জোরের কাছে সকল ভয়ই নেহাৎ বালখিল্য। কাউন্সিলিং ও থেরাপির মাধ্যমে ধাপে ধাপে ভয়ের উৎসের মুখোমুখি হওয়া এবং সমস্যাটির সম্বন্ধে চিন্তাপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা। একই ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষদের সাথে গ্রুপ থেরাপির মাধ্যমেও উপকার পাওয়া যেতে পারে। যোগব্যায়াাম ও ধ্যান জাতীয় রিল্যাক্সেশনের দ্বারাও ফোবিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

            ভয় নিয়ে মহান ব্যাক্তিদের অভিব্যাক্তি উদ্ধৃত করে প্রবন্ধের সমাপন করছি। ভয়কে জয় করার উপায় হিসাবে Dale carngie বলেছেন – Do the thing you fear to do and keep doing it…that is the quickest and surest way ever yet discovered to conquer fear. অর্থাৎ ভয়কে জয় করার জন্য, বারবার ভয়ের সম্মুখীন হওয়ার মতো সরল এবং নিশ্চিত উপায় নেই। 

            পরিশেষে সকলের প্রতি আমার বক্তব্য এটাই যে – সকলেই নিজেদের ভয় নিয়ে সর্বসমক্ষে আলোচনা করুন। নিজের ভয়কে লুকিয়ে রাখবেন না, এতে আখেরে আপনারই ক্ষতি হয়, আপনি যত বেশী ভয় নিয়ে কথা বলবেন ততই আপনার সেই বিষয়ের উপর ভীতি দূর হবে। 

Comments

Popular posts from this blog

মোহনবাগান ক্লাবের উজ্জ্বল ইতিহাস

স্বভাব